বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৫

সম্পাদকীয়





নবম সংখ্যার কাজ করছি, হঠাৎ ‘টিং’ করে নোটিফিকেশনের শব্দ শুনে উঁকি মারলাম পাশের ট্যাবে। ইনবক্স – ইন্দুমতী – একটা অ্যাটাচমেন্ট – ওপরে লেখা ‘তোমার জন্য’। খুলতেই দেখি একটা কবিতা – 



সবটুকুই তো তোমার 
কিছুই রাখিনি বাকি 
মাঝে মাঝে নিজেকেই 
ফাঁকি দিই আজও... 
যা পেলাম, একবার মিলিয়ে 
নিতে ইচ্ছে করে। 
পাওনা ছিলো কিনা- 
সেটাও তো জানা দরকার 
দয়ার দানে বড় ভয় 
করুণা কোরোনা কখনও আমায় 
যোগ্যতা থাকে যদি বিন্দুমাত্র 
দিও সমানুপাতিক 
অপ্রাসঙ্গিক মনে হলো বুঝি! 
জাফরিকাটা নকসা দেখে 
গভীর জলোচ্ছ্বাস – 
প্রাসঙ্গিক নয় কি? 
সবুজ পাহাড়ের ঠিক 
নীচটার চারণ ভূমিতে 
শুধু গাভী নয় 
গর্ভীনী মনও আতঙ্কে মরে 
তোমার শিখীচূড়ার নীল আভাস 
বিষে বিষে গাঢ় অপরাজিতা রঙ 
কাঠঠোকরার ঠকঠক ঠকঠক 
বকবক বকবক… ক্লান্তিতে 
দু’চোখ বুজে আসে 
বর্ষার মেঘ একটুকরো 
পাঠিয়ে দিয়ো তো বহুতলের 
কার্নিশে… বারান্দা-বাগানে 
বিরহিণী রাধিকা… এসো এসো পুরুষোত্তম 
একটু স্কচ আর চিকেন পপকর্ণ… 
রাত্রি এখনও যুবতী। তবুও 
আমাকে এবার যেতেই হবে। 
না না – সবুজ অন্ধকার নয়… 
ছাতিমের মাতাল গন্ধ আর 
শান্তিনিকেতনের রাস্তায় পড়ে 
থাকা পাকা তাল... 
সঙ্গে যদি আসতে চাও 
কোপাই-এর শুকনো খাদে 
পাশাপাশি শুয়ে থাকি চলো 
জল এলে যাবো না হয়
ভেসেই… ততক্ষণ শুধুই 
অপেক্ষা অপেক্ষা অপেক্ষা… 



কেমন যেন একটা বিষাদের ছোঁয়া কবিতাটায়... চিন্তা হলো মেয়েটার জন্য।


ইন্দুমতী আইয়ার। উপাধি টুকু ছাড়া অবশিষ্ট আদ্যন্ত আষ্টেপৃষ্ঠে বাঙালী। বছর আট-নয় আগে একটা সেমিনারে গেস্ট লেকচারার হয়ে গিয়েছিলাম শান্তিনিকেতনে, সেখানেই আলাপ ইন্দুর সঙ্গে। তন্বী শ্যামা অসম্ভব মিষ্টি একটা মেয়ে। আশ্চর্য সমাহিত এক চরিত্র। সেমিনার শেষ হয়ে গেলো বিকেল ৪টেয়, এদিকে ফেরার ট্রেন সেই শেষ সন্ধ্যায়। চা খেতে ডাকল সোনার তরী হাউসিং-এর একটা ছোট্ট ডুপ্লেক্সে ওর আস্তানায়। বাইরে ভেতরে ছবির মতন সাজানো বাড়িটার চৌকাঠ পেরতেই কেমন যেন মনটা ভাল হয়ে গেলো। সেবার ঘন্টা চারেকের আলাপচারিতায় এটুকু বুঝেছিলাম, মেয়েটার অনেক গুণ। 


এর বছর তিনেক পর লিঙ্গুইস্টিক্সের একটা ওয়ার্কশপের চিফ কো-অর্ডিনেটর হিসেবে ডাক পড়ল ওদের ওখান থেকেই। ও তখন ওই ওয়ার্কশপের প্রজেক্ট লিডার। তিন মাসের প্রজেক্ট। থাকার ব্যবস্থা ও নিজেই করেছে, কোনও গেস্ট হাউসে নয় – ওর নিজের বাড়িতে। এবার মেয়েটাকে খুব কাছ থেকে দেখার জানার সুযোগ হলো। এতগুলো গুণ একসঙ্গে একটা মানুষের থাকতে পারে, ওকে না দেখলে জানা হতো না। 


বাগান ও বাড়ির অন্দর সজ্জা – দুটোই করে নিজে হাতে। এবং করে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই। ওখানকার আবহাওয়ায় কোন গাছে কোন সময় কি সার দিতে হবে, কোন সময় কতটা ছেঁটে রাখতে হবে, কোন সময় গাছের গোড়ায় একটু পাথর আর বালি চাপা দিয়ে রাখতে হবে... পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান। আবার ঋতোপোযোগী অন্দর সজ্জা যে কাকে বলে, কোন জায়গার আলোর মাত্রা যে কেমন হওয়া উচিত, সপ্তাহের কোন দিন খাবার টেবিলে কোন প্ল্যান্ট, কি ভাবে থাকা উচিত... কোনও ফর্মাল ট্রেনিং ছাড়া এমন নিখুঁত অবহিতি যে কি করে হলো, তাও ধারণার অতীত। নিজে হাতে রান্না করতো। রান্না করতে করতে কাঁচি দিয়ে সব্জির খোসা কেটে কেটে রান্না ঘরের টেবিলের ওপর সাজিয়ে সাজিয়ে অমন অপূর্ব আলপনা দিয়ে রাখতে আমি আর কাউকে দেখিনি। সারা বাড়িতে ওর নিজের হাতে আঁকা অসাধারণ সব যামিনী রায় স্টাইলের পেইন্টিং। ঝরঝরে বাংলা লেখার হাত। অপূর্ব গানের গলা। ওদিকে আবার একই সঙ্গে ওড়িশি আর মনিপুরী ড্যান্সে স্পেসালাইজেশন। অথচ এতো যে গুণ, কাছ থেকে না মিশলে বাইরে থেকে দেখে একটুও বোঝার উপায় নেই। আমি ওর গুণে পাগল হয়ে গেলাম। সখিত্য আরো গাঢ় হলো, কথায় কথায় যখন জানতে পারলাম একেবারে সাল তারিখ মিলিয়ে আমাদের জন্মদিনটা এক। 


দিন কয়েকের মধ্যে ইন্দু আমাকে ওর এক বিশেষ বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করাতে নিয়ে গেলো। গিয়ে দেখি আবীরলাল মুখোপাধ্যায়। আবীরকে আমি চিনি। সেই যাদবপুরে পড়ার সময় থেকে। কোন যোগাযোগ ছিলো না অবশ্য। শুনলাম আবীরও এখানে এসেছে একটা প্রজেক্ট-এর কাজেই। ওর প্রজেক্টটা হলো – হ্যান্ডিক্রাফ্ট অফ রুরাল বেঙ্গল: রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট-এর ওপর একটা ডকু-ফিল্ম বানানো। একটা বিদেশী কম্পানি স্পনসর করছে। এখানে আছে বেশ কিছু দিন। থকতে হবে আরো বেশ কিছু দিন। আবীর একটা ঝলমলে চরিত্র। ছটফটে, আনন্দপ্রিয়, সৌন্দর্য পিয়াসি মানুষ। আর ঠিক এই জায়গাতেই ওদের আত্মার বন্ধন, আমি বেশ উপলব্ধি করতে পারলাম। 


সারা দিনের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ওরা দেখা করে নিতো ঠিক। কখনো ওদের দেখতাম স্টুডেন্ট হস্টেলের পিছনের সিঁড়িতে, কখনো বা ছাতিম তলার সামনের আমবাগানের বেঞ্চিতে। আবীরের মতো ছটফটে মানুষটাও ইন্দুর পাশে কেমন যেন শান্ত হয়ে যেতো। বিকেলের দিকটায় ওদের প্রায়ই দেখতাম উদয়নের প্রাঙ্গণে, উদিচীর বারান্দায় পাশাপাশি চিত্রার্পিতের মত নিশ্চুপ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছে। ওদের এই বহিঃপ্রকাশের উচ্ছ্বাসহীন নিবিড় আত্মীয়তা দেখতে দেখতে তিন মাস কেটে গেলো। আমার কাজ শেষ। আমি কলকাতায় ফিরে এলাম। কিন্তু ওদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগটা রয়েই গেলো। এর প্রায় আড়াই মাস পর শুনলাম আবীরের কাজও শেষ। আবীর কলকাতায় ফিরছে। এখান থেকে সোজা যাবে বিদেশী স্পনসর কম্পানির হেড অফিসে। 


এরপর সে এক অন্য ইতিহাস। ইন্দুর লেখায় লেখায় ঝরে ঝরে পড়তে লাগলো আবীরের যশের গল্প। সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছে আবীর। ইন্দুর কাছেই খবর পাই। তারপর হঠাৎ করেই ধীরে ধীরে একদিন বদলে যেতে শুরু করলো ইন্দুর লেখার ভাষা। উচ্ছ্বাসটা কমে এলো ক্রমে ক্রমে। আবার সেই শান্ত সমাহিত আত্মস্থ ইন্দুমতী। কিন্তু বিষণ্ণতার মালিন্য কখনও স্পর্শ করেনি ইন্দুকে। তবে আজ কেন এই বিষাদের সুর? তবে কি দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের কোন সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে? তাই কি ইন্দু একটু শঙ্কিত? শুনেছিলাম যেন কার কাছে, আবীর ফিরছে দেশে। এত দীর্ঘ দিন পরেও কি আবীর সেই আগের মতনই আছে? চিন্তা হচ্ছে এবার ইন্দুর জন্য, বড় স্পর্শকাতর মেয়ে। আমি যাই, একটু খোঁজ নিয়ে আসি মেয়েটার। আপনারা বরং ততক্ষণ ডুব দিন ‘এবং একুশ’-এ। 


শুভেচ্ছা নিরন্তর...
সুস্মিতা বসু সিং 













এবং একুশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন